বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহন কি অবধারিত ছিল?
বা
ভারত অংশগ্রহন না করলে কি বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেত না?
################################################
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভে ভারত ও মুক্তিবাহিনীর অবদান সমান সমান।
তাই এককথায় কাউকেই সম্পূর্ণ ক্রেডিট দেয়া অসম্ভব ব্যপার।
###############################################
ভিয়েতনাম যুদ্ধে ভিয়েত-কং গেরিলার তৎপরতার সর্বশেষ পর্যায় ছিল উত্তর ভিয়েতনামের নিয়মিত বাহিনীর সাহায্য আর চীনের ছিল 4th route army.
তাই বাংলাদেশ যে ভাবে গেরিলা যুদ্ধ চালাচ্ছিল তার সর্বশেষ পর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহায্য অবশ্যই দরকার ছিল,কারন বাংলাদেশে সে সময় কোন সুগঠিত সেনাবাহিনী ছিল না। মুক্তিফৌজে সৈন্য সংখ্যা ছিল নিতান্তই অপ্রতুল।
তাই সে সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহায্য ছাড়া অন্যকিছু সম্ভব বলে মনে করতেন না।(সূত্রঃমূলধারা ৭১।)
কিন্তু এটাও সত্য যে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বীরত্বপূর্ন সংগ্রাম ছাড়া ভারতের কোন পদক্ষেপ নেয়ার সক্ষমতা সে সময় ছিল না। ভারত একাই যদি পাকিস্তানি বাহিনীকে হারিয়ে দিতে সক্ষম হত,তবে এপ্রিল মাসে যখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরনার্থী আসতে শুরু করে,তখনই সৈন্য পাঠিয়ে পূর্ব বাংলার কিছু অংশ স্বাধীন করে সেখানেই শরনার্থীদের রাখার ব্যবস্হা করতে পারত। ভারতের সময় দরকার ছিল।প্রকৃতপক্ষে ভারত সেসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না,চীন এবং আমেরিকার হস্তক্ষেপের ভয়ে ভীত ছিল এবং ভারতের দক্ষিণপন্থী নেতাদের একটা বড় অংশ ভাবত যে আমোরিকার হস্তক্ষেপে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন সমস্যা মিটে যাবে। তাই তারা ভারতকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল এবং বাংলাদেশের যোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছিল।
তাই এই বিশৃঙ্খল পরিবেশে একটা পূর্নাঙ্গ সরকার গঠন করে ভারত ও সোভিয়েত সরকারের সমর্থন আদায়ের পুরো কৃতিত্ব বাংলাদেশের। এখানে উল্লেখ্য যে ভারত সোভিয়েতের সাথে আলোচনার আগেই বাংলাদেশ সরকার থেকে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সাথে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ যদি সে পর্যায়ে ভেঙে পরত তবে ভারত বা সোভিয়েত কেউই পরবর্তী স্টেপ নেবার কথা ভাবতে পারত না। বাংলাদেশকে একা লড়াই করে ৮মাস+ টিকে থাকতে হয়েছে,ভারতকে আক্রমণ করতে দেয়ার সুযোগ ও পরিস্হিতি সৃষ্টি করে দিতে হয়েছে তীব্র অস্ত্র সংকট ও খাদ্য সংকটের মধ্যেও।
তাই মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যে ভারত ও বাংলাদেশ পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। বাংলাদেশ ভিত্তি তৈরী করতে না পারলে এবং টিকে থাকতে না পারলে ভারত আক্রমণ করতে পারত না এবং ভারত তার সেনাবাহিনী নিয়ে শেষে ঝাঁপিয়ে না পরলে গেরিলা যুদ্ধ কৌশলের চূড়ান্ত ধাপ অতিক্রম না করে স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হত না। ভিয়েতনাম বলি বা চীন,সবাই-ই এ চূড়ান্ত ধাপ অতিক্রম করেই সফল হয়েছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের কৃতিত্ব ভারত ও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সমান সমান। এদের সম্মিলিত প্রয়াস ব্যতীত এ যুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব ছিল না।
#####
অনেকেই বলতে পারেন, ভারত তো অস্ত্র দিয়ে, ট্রেনিং দিয়েছে। হা,দিয়েছে। তবে একটা যুদ্ধ পুরোদমে চালানোর জন্য তা অপ্রতুল ছিল। একাত্তরের দিনগুলোতে গ্রন্থে জাহানারা ইমাম উল্লেখ করেছেন, ভারত থেকে মুক্তিবাহিনী ট্রেনিং নিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যপার। অথচ প্রতি মুহুর্তেই নতুন নতুন মুখ যোদ্ধা হবার আশায় জড়ো হচ্ছিল। তাই সেক্টর ২ এর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ নিজেই ট্রেনিং দিয়ে তার দলে নিয়ে নিত যোদ্ধাদের। ভারতে থাকা কেন্দ্রীয় কমান্ডকেও এই অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে তেমন জানাতো না।রাজাকার বা শত্রুপক্ষের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা অস্ত্র তাদের দেয়া হত। একজনের খাবার চারজন ভাগ করে খেত। ভারতের ভয় ছিল যে নাগা বা মিজো চরমপন্থীরা এ অস্ত্রের নাগাল পেয়ে গেলে সমস্যা হবে। আর দক্ষিণপন্থী নেতারা ভারতের এ বিষয়ে জড়িয়ে পরার ঘোরতর বিরধী ছিলেন। বলা যেতে পারে,পুরো ভারত নয় বরং ইন্দিরা গান্ধীর একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বেনিফিটেড হয়েছে কিন্তু এই বেনিফিট তখনই এসেছে যখন বাঙালিরা তাদের যুদ্ধ করার সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা লাভের ঐকান্তিক কামনা তুলে ধরতে পেরেছে।
তাদের এই প্রচেষ্টায় ভারত আশ্বস্ত হয়েছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে চুক্তিবদ্ধও হয়েছে।
মুক্তিবাহিনী যদি টিকে না থাকতে পারত তবে শুরু থেকে ভারত যে সংরক্ষণশীলতার নীতি পরিচালনা করছিল তা অব্যাহত রাখত।
![]() |
|


0 Comments