সাম্যবাদ বনাম সমাজতন্ত্র ; সমাজতন্ত্রের ভালো দিকগুলি কী কী বলে আপনি মনে করেন?

সাম্যবাদ বনাম সমাজতন্ত্র

সমাজতন্ত্রঃ সমাজতন্ত্র হল এমন এক বিশেষ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনযন্ত্রের (জমি, কল-কারখানা, খনি ইত্যাদি) ব্যক্তি মালিকানা থাকে না। অর্থাৎ এ ব্যবস্থায় জনগণ জমি, কারখানা ইত্যাদির মালিক হতে পারবে না। রাষ্ট্রের সকল জমি, কারখানা, খনি, সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, আদালত, হাসপাতাল ইত্যাদি) মালিক হবে সরকার। সকলে যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারের এসব জমি, কারখানা, সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করবে এবং নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন পাবে। বেতনের ক্ষেত্রে সকলকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী ন্যায্য বেতন দেয়া হবে, তবে সকলের সমান বেতন পাবে না। কেননা সবার যোগ্যতা ও কাজের পরিমাণ সমান নয়। এ সমাজে সরকার নিজে সকলের জন্য কাজের ব্যবস্থা করে, তাই এখানে বেকারত্ব থাকে না। সমাজতন্ত্রে গরিব মানুষদের ঠকানোর সুযোগ নেই এবং সমাজের কল্যাণের জন্যই সরকারের সকল কাজ পরিচালিত হয়, লাভের জন্য নয়।


সাম্যবাদঃ একটা সমাজে সমাজতন্ত্র অনেক দিন চালু থাকলে মানুষ সম্পদের প্রতি লোভ ত্যাগ করে সাম্যবাদী সমাজ চালু করবে। সাম্যবাদী সমাজে সকলে নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করবে এবং সে অনুযায়ী ভোগ করবে। কেউ সম্পদ জমানোর চিন্তা করবে না এবং পারষ্পরিক সহযোগিতায় সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তুলবে। এ সমাজে ধনী-গরিব বলে কোনো শ্রেণি থাকবে না। মজার ব্যাপার হল, সাম্যবাদী সমাজে কোনো সরকার, পুলিশ, সেনাবাহিনী, কারাগার ইত্যাদি থাকবে না। কেননা সাম্যবাদী সমাজের মানুষের সম্পদের প্রতি লোভ নেই, তাই তারা কোনো অপরাধও করবে না। এ ধরনের সমাজের রূপরেখা দিয়েছিলেন দার্শনিক “কার্ল মার্কস”। সাম্যবাদ হল সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ।

সাম্যবাদে বেতন-ভাতা বলে কিছুই নেই। এখানে সকলেই নিজ নিজ প্রয়োজন অনুসারে কাজ করে এবং সম্পদ জমায় না। আর সমাজতন্ত্রে সকলের বেতন এক নয়। সকলে নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পায় ও কাজ অনুযায়ী বেতন পায়। বর্তমানের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও (যারা নিজেদের সাম্যবাদী বলে থাকে) এই নিয়ম অনুসরণ করে।


সমাজতন্ত্রের ভালো দিকগুলি কী কী বলে আপনি মনে করেন?

সমাজতন্ত্রের বেশ কিছু ভালো দিক রয়েছে৷ মাত্র পাঁচটি দিক উল্লেখ করছি৷

  • সমন্বিত ফসল উৎপাদন
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ভূমির মালিকানা ব্যক্তির হাতে থাকায় ফসল উৎপাদনে কোনো সমন্বয় থাকে না। ভূমি মালিকরা বা কৃষকরা নিজেদের সুবিধামত ফসল উৎপাদন করেন। ফসল উৎপাদনে কোনো পরিকল্পনা না থাকায় কখনো চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি ফসল উৎপন্ন হয় যার ফলে কৃষক নায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হোন। আবার কখনো কম উৎপন্ন হয় যার ফলে দ্রব্যমূল্য জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়।
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভূমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে থাকায় কেউ ইচ্ছামত ফসল ফলাতে পারে না। রাষ্ট্র ফসলের চাহিদা নিরূপণ করে সেই অনুপাতে জমি ভাগ করে দিয়ে ফসল উৎপাদন করতে পারে। এরফলে ফসল উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

  • বাসস্থানে সাম্যাবস্থা
আমাদের দেশে এমন মানুষ আছে যারা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি জমি বা ফ্ল্যাট অধিকার করে আছে। অপরদিকে এমন মানুষও আছে যাদের সামান্য মাথা গোজার ঠাই না থাকায় ফুটপাতে রাত কাটাতে হচ্ছে।
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এই অসাম্য ও বঞ্চনা দূর করে। সব ভূ-সম্পত্তিকে রাষ্ট্র নিজের করায়ত্তে আনে। ফলে কারো হাতে প্রয়োজনের বেশি জমি বা ফ্ল্যাট থাকে না। অতিরিক্ত জমি বা ফ্ল্যাটগুলোতে ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করা যায়।

  • পরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষা
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ভূমি ব্যক্তির হাতে থাকায় ব্যক্তি নিজের ইচ্ছেমত বাড়ি-ঘর, অফিস-ব্যবসালয় তৈরি করতে থাকে। স্বাভাবিক ভাবেই আলাদা আলাদা ব্যক্তির নির্মাণে কোনো সমন্বয় থাকে না। ফলত এলাকাগুলো অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠতে থাকে।
সমাজতন্ত্রে পুরো ভূমি রাষ্ট্রের হাতে থাকায় কর্তৃপক্ষের একক পরিকল্পনায় পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
আমাদের দেশের সরকারি কলোনিগুলোতে দেখবেন সেখানে দালানগুলো সাজানো-গোছানো করে গড়ে তোলা। কর্তৃপক্ষের একক পরিকল্পনায় এসব কলোনি গড়ে উঠে বলেই এমন পরিকল্পিত অবকাঠামো দেখা যায়।
একইভাবে সরকারের হাতে ভূমি থাকায় পরিকল্পিত বনায়ন করে পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখা যায়।

  • ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের গুরুতর সমস্যা হল সম্পদশালীরা নিজেদের পক্ষে অন্যায়ভাবে সম্পদকে ব্যবহার করে। টাকার জোরে প্রশাসনকে কিনে নেয়, বিচারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অন্যায় করেও টাকার জোরে সম্পদশালীরা বেঁচে যেতে পারে। টাকার প্রতিযোগিতায় ন্যায়বিচারের দৌড়ে গরিবরা বরাবর হেরে যায়।
সমাজতন্ত্র এই সমস্যার সমাধান দেয়। সম্পদে ব্যক্তির অধিকার বাতিল হওয়ার ফলে চাহিদার অতিরিক্ত সম্পদ কারো কাছে থাকে না। কাজেই সেখানে 'সম্পদশালী' বলে কেউ থাকে না। সুতরাং সম্পদ ব্যবহার করে বিচার প্রভাবিত করার সুযোগও থাকে না।

  • দুর্নীতির পথ বন্ধ
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সম্পদের মালিকানা ব্যক্তির হাতে থাকে। ব্যক্তির সম্পদে রাষ্ট্র হাত দেয় না বলে ব্যক্তি খেয়াল-খুশিমত সম্পদ বৃদ্ধি করতে থাকে এবং এমনটা করতে গিয়ে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে বসে।
সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তির কাছে থাকা অতিরিক্ত সম্পদ রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করে যার ফলে ইচ্ছেমত সম্পদ আহরণ করে বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা গড়ার সুযোগ থাকে না। ফলে দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের আগ্রহও থাকে না।
একজন মানুষ যদি এটা জানে যে তাকে দিন শেষে তার সব সম্পদ সরকারের তহবিলে জমা দিতে হবে তাহলে সে দুর্নীতি করে সম্পদ জমা করার কষ্ট করতে যাবে না।

সাম্যবাদ বনাম সমাজতন্ত্র

সাম্যবাদ বনাম সমাজতন্ত্র


Post a Comment

0 Comments