১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী কেনো বাংলাদেশের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণ করেনি?

বিসিএস ভাইভা প্রশ্ন

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী কেনো 

বাংলাদেশের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণ করেনি?


প্রথমে বলে রাখি, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের #সর্বাধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
#সেনাপতি ছিলেন কর্ণেল এমএজি ওসমানী এবং 
#উপ সেনাপতি ছিলেন এ.কে খোন্দকার। 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করে ভারত এবং সেই সহযোগিতার অংশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে তাঁদের সেনাবাহিনী পাঠায়। বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে  মুক্তিযুদ্ধের মিত্রবাহিনী বলা হয়।

১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল শ্যাম মানেকস, সে হিসেবেই তিনি মিত্রবাহিনীর প্রধান।

১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীকে নিয়ে যৌথবাহিনী গঠন করা হয়। যেহেতু এমএজি ওসমানী তখন কর্ণেল পদমর্যাদায় ছিলেন এবং যেহেতু বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃত কোনো বাহিনী ছিলো না, তাই যৌথবাহিনীর প্রধান করা হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে।

জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা যৌথবাহিনীর প্রধান হলেও যৌথবাহিনী ছিলো ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল শ্যাম মানেকস এর  কমান্ডের অধীন।

এখন আসি পদমর্যাদার দিকে। যেহেতু জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ছিলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধান, তাই  সার্বভৌমত্বের দিক দিয়ে তাঁর মর্যাদা  কর্নেল এমএজি ওসমানীর  সমান নয়। 

আবার জেনারেল একে নিয়াজি ছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান।

সার্বভৌমত্বের হিসাবে পাকিস্তানের  জেনারেল একে নিয়াজি, ভারতের জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা  এবং বাংলাদেশের একে খোন্দকার মর্যাদায় সমান।

যেহেতু এমএজি ওসমানী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান এবং জেনারেল শ্যাম মানেকশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান,  তাই সার্বভৌমত্বের দিক দিয়ে তাঁদের দুজনের মর্যাদা সমান।

এখন আসি আত্মসমর্পণের মূল কথায়। কেনো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণ করেনি।

আপনারা হয়তো জেনেভা কনভেনশনের কথা শুনেছেন। এতে বলা আছে- একাধিক রাষ্ট্র কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যদি কোনো পক্ষ পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করতে চায়, তাহলে জেনেভা কনভেনশনের চুক্তি অনুযায়ী বিজয়ী দেশ  পরাজিত দেশের বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে বাধ্য থাকবে।

নব সৃষ্ট বাংলাদেশ যেহেতু তখন জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ ছিলো না, তাই পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। বাংলাদেশ যেহেতু পাকিস্তানি সেনাবাহিনিকে সুরক্ষা দিতে বাধ্য নয়, তাই  পাকিস্তানি বাহিনীতে ভয় ছিলো যে, আত্মসমর্পণ করার পর বাংলাদেশ পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানের ৯৩০০০ হাজার পরাজিত সৈন্যকে মেরে ফেলতে পারে।

তাই পাকিস্তানিরা জেনেশুনে সে ঝুঁকি নেয়নি। 

ভারত যেহেতু জেনেভা কনভেনশনের চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র ছিলো, তাই পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের নিজেদের সুরক্ষার স্বার্থে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করাকে সুবিধাজনক মনে করেছিলো।

আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে যৌথবাহিনীর পক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল  শ্যাম মানেকস উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও তিনি উপস্থিত হতে পারেন নি।

ফলে পাকিস্তানি বাহিনী যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পন করে। আত্মসমর্পণের দলিলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্মিলিত যৌথবাহিনীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা , পাকিস্তানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর প্রধান জেনারেল একে নিয়াজি এবং বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশের উপ সেনাপ্রধান একে খোন্দকার। সার্বভৌমত্বের হিসেবে তাঁরা তিনজনই সমান মর্যাদার অধিকারী।

আত্মসমর্পণের দলিলে ভারতীয় জেনারেল স্বাক্ষর করার ফলে  পাকিস্তান কি ভারতের কাছে আত্মসমর্পন করেছে?
 উত্তর হলো- না।

পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করেছে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের কাছে। সেই এখতিয়ার বাংলাদেশ সরকার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে দিয়েছে।

আত্মসমর্পনের যে দলিল সেটা ইনস্ট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার নামে পরিচিত। দলিলটির বামদিকে নিচে অরোরা যেখানে স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে লেখা আছে জেনারেল অফিসার কমান্ডার ইন চীফ ইন্ডিয়ান অ্যান্ড বাংলাদেশ ফোর্সেস ইন দ্য ইস্টার্ন থিয়েটার।

এটা থেকেই স্পষ্ট, বাংলাদেশ ভারতের কাছে নয়, যৌথবাহিনির কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পন করেছে অর্থাৎ পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের কাছেই আত্মসমর্পন করেছে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্ণেল এমএজি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না কেনো?

এটার ব্যাখ্যা হলো-
যদি আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে  ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল শ্যাম মানেকস উপস্থিত হতেন এবং স্বাক্ষর করতেন, তাহলে প্রটোকল অনুযায়ী জেনারেল এমএজি ওসমানীকেও থাকতে হতো এবং স্বাক্ষর করতে হতো। এমএজি ওসমানীর ভাষায়- মূলত তিনি সে কারনেই আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।


সবাইকে ধন্যবাদ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী কেনো বাংলাদেশের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণ করেনি?

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী কেনো বাংলাদেশের কাছে সরাসরি আত্মসমর্পণ করেনি?




Post a Comment

0 Comments